লেখক-সাংবাদিক কমরেড মুজফ্ফর

52

সংবাদপত্র, সাহিত্য ও সংস্কৃতির সংগ্রাম যে রাজনৈতিক আন্দোলনের অবিচ্ছেদ্য অংশ, তা কমরেড মুজফ্ফর আহমদ তার কার্যক্রমের মাধ্যমে সমকালীন সামাজিক পরিস্থিতিতে উত্তরসূরিদের স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন। ভারতীয় উপমহাদেশের কমিউনিস্ট আন্দোলনের পুরোধা কমরেড মুজফ্ফর আহমদ। চট্টগ্রাম জেলার সন্দ্বীপ উপজেলার মুছাপুর গ্রামে ১৮৮৯ সালের ৫ আগস্ট তিনি জন্মগ্রহণ করেন।

বাবা মনসুর আলী সন্দ্বীপের আদালতে আইন ব্যবসায় নিয়োজিত ছিলেন। ১৯০৫ সালে তিনি মারা যান এবং সংসারের অভাব-অনটনের কারণে মুজফ্ফরের পড়াশোনা বন্ধ হয়ে যায়। কিছুদিন তিনি বরিশালের বুড়িরচরে গৃহশিক্ষকতা করেন। ১৯০৬ সালে পুনরায় সন্দ্বীপে ফিরে এসে কার্গিল হাইস্কুলে ভর্তি হন। পড়াশোনার পাশাপাশি তিনি লেখালেখি করার চেষ্টা করতেন।

১৯০৭ সালে কলকাতার সাপ্তাহিক ‘সুলতান’ পত্রিকায় তার প্রথম লেখা প্রকাশিত হয়। তিনি সন্দ্বীপে থাকাকালীন ওই পত্রিকায় স্থানীয় সংবাদ পাঠাতেন। ১৯১৩ সালে ২৩ বছর বয়সে নোয়াখালী জেলা স্কুল থেকে ম্যাট্রিক পাশ করেন। ১৯১৫ সালে কলকাতা বঙ্গবাসী কলেজ থেকে আইএ পাশ করেন এবং কলকাতা মুসলিম সাহিত্য সমিতির সম্পাদক নির্বাচিত হন।

১৯১৬ সালে এক বছর ধরে বিভিন্ন স্থানে চাকরি করেন। ১৯১৭ থেকে ১৯১৯ সাল পর্যন্ত বঙ্গীয় মুসলিম সাহিত্য সমিতির সার্বক্ষণিক কর্মী হিসাবে সাংবাদিকতা ও লেখালেখির কাজে নিয়োজিত ছিলেন। প্রাক স্বাধীনতা যুগে সার্বক্ষণিক রাজনৈতিক কর্মী হওয়ার আগে ও পরে সাংবাদিকতার সঙ্গে যোগসূত্রতা তিনি ত্যাগ করেননি। ১৯১৮ সালে তিনি বঙ্গীয় সাহিত্য সমিতির সার্বক্ষণিক কর্মী থাকাবস্থায় বঙ্গীয় মুসলিম সাহিত্য পত্রিকা বের হতো। ওই পত্রিকার যুগ্ম সম্পাদক হিসাবে ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ ও মোহাম্মদ মোজাম্মেল হকের নাম ছাপা হলেও সম্পাদকীয় সব কাজ মুজফ্ফর আহমদই করতেন।

১৯১৯ সালে জালিয়ানওয়ালাবাগের হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে কলকাতায় অনুষ্ঠিত বিক্ষোভ সমাবেশে তিনি অংশগ্রহণ করেন। কাজী নজরুল ইসলাম যখন বাঙালি রেজিমেন্টে ছিলেন, তখন তার লেখা অনেক কবিতা সাহিত্য পত্রিকায় ছাপা হতো। পত্র যোগাযোগের মাধ্যমে নজরুলের সঙ্গে মুজফ্ফর আহমদের বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে। ১৯২০ সালে নজরুল কলকাতায় সাহিত্য সমিতির অফিসে ওঠেন এবং কমরেড মুজফ্ফর আহমদের সঙ্গে একত্রে বসবাস করেন। নজরুল তার বিখ্যাত ‘বিদ্রোহী’ কবিতা ওখানে বসেই লেখেন এবং কমরেড মুজফ্ফরকে প্রথম পাঠ করে শোনান।

ভারতীয় উপমহাদেশে সাহিত্যচর্চা, সাংবাদিকতা ও সংবাদপত্রের ক্ষেত্রে নতুন ধারা সৃষ্টি করেন কমরেড মুজফ্ফর ও নজরুল। এ ধারা উপমহাদেশের গণমানুষের মুক্তির ধারা। ১৯২০ সালে প্রকাশিত হয় সান্ধ্য দৈনিক ‘নবযুগ’। এ পত্রিকার মালিক ছিলেন এ কে ফজলুল হক এবং যুগ্ম সম্পাদক ছিলেন কমরেড মুজফ্ফর ও নজরুল। নজরুলের অগ্নিবীণার জাগরণমূলক কবিতার অধিকাংশই এ পত্রিকায় ছাপা হয়েছিল।

এক বছর পর নানা কারণে পত্রিকাটি বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর নজরুল প্রকাশ করেন ‘ধুমকেতু’ (১৯২২) ও ‘লাঙ্গল’ (১৯২৫)। লাঙ্গল পত্রিকা ছিল তৎকালীন অবিভক্ত বাংলার কমিউনিস্টদের প্রথম মুখপত্র। মুজফ্ফর আহমদ পত্রিকা দুটির সঙ্গে ঘনিষ্ঠ ছিলেন। এরপর তার সম্পাদনায় প্রকাশিত হয় ‘গণবাণী’ পত্রিকা। নজরুলের বহু বিখ্যাত কবিতা গণবানীতে প্রকাশিত হয়েছে। ১৯৩৬ সালের ১৮ জুন মস্কোয় মাক্সিম গোর্কির মৃত্যুতে প্রগতি শিবিরের লেখক-সাংবাদিকরা সিদ্ধান্ত নেন সারা ভারতবর্ষে গোর্কির প্রতি শ্রদ্ধা জানানো হবে এবং গোর্কি দিবস পালন করা হবে।

এ উপলক্ষ্যে ১১ জুলাই কলকাতার অ্যালবার্ট হলে এক শোকসভার আয়োজন করা হয়। এ সভার আয়োজকদের মধ্যে ছিলেন কাজী নজরুল ইসলাম, হীরেন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়, বিবেকানন্দ মুখোপাধ্যয় প্রমুখ।

এ সভাতেই নিখিল বঙ্গ প্রগতি লেখক সংঘ আনুষ্ঠানিকভাবে গঠিত হয়। কমরেড মুজফ্ফর এ সভায় সংঘের সাফল্য কামনা করে বক্তব্য রাখেন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর গোর্কির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে একটি বাণী পাঠিয়েছিলেন। তিনি প্রথম থেকেই প্রগতি সাহিত্য আন্দোলনের সমর্থক ছিলেন।

ধীরেন হালদার : সভাপতি, অরণি পাঠাগার, স্বরূপকাঠি, পিরোজপুর