জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর রক্তের ঋণ শোধ করতে হবে’

59

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বাংলাদেশকে জাতির পিতার স্বপ্নের ক্ষুধা ও দারিদ্র মুক্ত এবং উন্নত-সমৃদ্ধ সোনার বাংলাদেশ হিসেবে গড়ে তোলার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করে বলেছেন, এর মাধ্যমেই আমাদের তার রক্তের ঋণ শোধ করতে হবে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘জাতির পিতা এদেশের মানুষের জন্য রক্ত দিয়ে আমাদের রক্ত ঋণে আবদ্ধ করে গেছেন। আমাদেরও একটাই লক্ষ্য, তার এই রক্তের ঋণ শোধ করতে হবে।

প্রধানমন্ত্রী মঙ্গলবার সন্ধ্যায় ১৫ আগস্ট জাতীয় শোক দিবস উপলক্ষে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশত বার্ষিকী উদযাপন জাতীয় বাস্তবায়ন কমিটির উদ্যোগে ভার্চুয়াল প্লাটফর্মে আয়োজিত এবং বাংলাদেশ টেলিভিশনে প্রচারিত আলোচনা সভায় পূর্ব ধারণকৃত এক ভিডিও বার্তায় একথা বলেন।  ‘শোক থেকে শক্তি, শোক থেকে জাগরণ’ শীর্ষক আলোচনা সভায় প্রধানমন্ত্রী সভাপতিত্ব করেন।

শেখ হাসিনা বলেন, জাতির পিতার আত্মত্যাগ কখনও বৃথা যেতে পারে না। বাংলাদেশকে জাতির পিতার ক্ষুধা ও দারিদ্রমুক্ত উন্নত সমৃদ্ধ সোনার বাংলা হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। আর সেই প্রতিজ্ঞা নিয়ে সেই আদর্শ নিয়েই আমাদের পথচলা।

তিনি বলেন, আমি সব হারিয়েছি। আমি জানি হারানোর বেদনা খুব কষ্টকর। সেই কষ্ট সহ্য করে একটা লক্ষ্য নিয়েই কাজ করে যাচ্ছি। সেই শোককে শক্তিতে পরিণত করে এদেশের মানুষের ভাগ্য পরিবর্তন করাই লক্ষ্য। ইনশাআল্লাহ, এই বাংলাদেশকে জাতির পিতার ক্ষুধা ও দারিদ্র মুক্ত, উন্নত-সমৃদ্ধ সোনার বাংলাদেশ হিসেবে আমরা গড়ে তুলব। যে দেশের স্বপ্ন আমার বাবা জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান দেখেছিলেন, সেই স্বপ্ন ইনআশাল্লাহ বাস্তবায়িত হবে।

’৭৫ সালের ১৫ আগস্ট ভোর রাতে সেনাবাহিনীর কিছুসংখ্যক বিপথগামী সদস্য ধানমন্ডির বাসভবনে স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি এবং ইতিহাসের মহানায়ক জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যা করে। ঘাতকদের হাতে একে একে প্রাণ হারান বঙ্গবন্ধুর সহধর্মিনী বঙ্গমাতা বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিব, তাদের তিন সন্তান এবং দুই পুত্রবধু, বঙ্গবন্ধুর অনুজ ও ভগ্নিপতি এবং সামরিক সচিব ব্রিগেডিয়ার জামিলসহ পরিবারের ১৮ জন সদস্য ও ঘনিষ্ঠজন। এ সময় বঙ্গবন্ধুর দু’কন্যা শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা বিদেশে থাকায় প্রাণে বেঁচে যান।

প্রধানমন্ত্রী ’৭৫ এর ১৫ আগস্ট শহিদদের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করে বলেন, জাতীয় শোক দিবস আমাদের জন্য শোকের দিন, কষ্টের দিন। কিন্তু বাঙালি জাতির জন্য সব হারানোর দিন।

তিনি অনুষ্ঠানে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট ঘাতকের নির্মম বুলেটের আঘাতে যারা শাহাদতবরণ করেছেন তাদের আত্মার মাগফিরাত কামনা করেন ও দেশবাসীর কাছে তাদের জন্য দোয়া চান।

তিনি বলেন, বাংলাদেশ স্বাধীন দেশ। জাতির পিতার আহ্বানে সাড়া দিয়ে এ দেশের মানুষ অস্ত্র হাতে তুলে নিয়ে দেশ স্বাধীন করেছিল। লাখো শহিদের রক্তের বিনিময়ে আমরা স্বাধীনতা পেয়েছি। প্রধানমন্ত্রী মুক্তিযুদ্ধের ৩০ লাখ শহিদ এবং সম্ভ্রমহারা দু’লাখ মা-বোনকেও শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করেন।

আজীবন শোষণ-বঞ্চণার শিকার এ দেশের নিরন্ন দুঃখী জনগণের কথা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, যারা শোষণ-বঞ্চণা, নিপীড়ন-নির্যাতনের শিকার তাদের মুক্তির জন্যই জাতির পিতা তার জীবনটাকে উৎসর্গ করেছিলেন। পরাধীনতার নাগপাশ থেকে বাংলার মানুষকে মুক্তি দিয়ে একটা উন্নত জীবন যাতে তারা পায় সেটাই জাতির পিতার একমাত্র লক্ষ্য ছিল। তিনি চেয়েছিলেন এ দেশের ক্ষুধার্ত বুভূক্ষ নর-নারী, যাদের পরনে ছিন্ন কাপড়, যারা শিক্ষার আলো ও চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত তাদের জীবনটাকে সুন্দরভাবে গড়ে তোলা। তাই, নিজের জীবনটাকে তিনি উৎসর্গ করেছিলেন বাংলার মানুষের কল্যাণের জন্য, তাদের অর্থনৈতিক মুক্তির জন্য। ক্ষুধা-দারিদ্র থেকে মুক্তি পেয়ে বাঙালি জাতি যেন বিশ্ব দরবারে মাথা উঁচু করে চলতে পারে। কিন্তু জাতির পিতা নিজের জীবনে কিছুই চাননি।

বাংলার জনগণের অধিকার আদায়ের সংগ্রাম করতে গিয়ে জাতির পিতার জীবনের একটি বড় অংশ কারাগারে থাকার স্মৃতিচারণ করে শেখ হাসিনা বলেন, জাতির পিতা জীবনের সব থেকে মূল্যবান সময়টাই কারাগারের অন্ধকার প্রকোষ্ঠে কাটিয়েছেন। তাকে বারবার হত্যার চেষ্টা করা হয়, ফাঁসি দিয়ে হত্যার চেষ্টা করা হয়, মিথ্যা মামলা দিয়ে তাকে হয়রানি করা হয়। কিন্তু সেই মিথ্যা মামলা দিয়ে তাকে যে হয়রানি করা হয়েছে বা এতবার হত্যার চেষ্টা করা হয়েছে তবুও তিনি তার আদর্শ থেকে এতটুকু বিচ্যুত হননি।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলার মানুষের মুক্তি অর্জনের জন্য তিনি সংগ্রাম করে গেছেন এবং তারই ডাকে সাড়া দিয়ে বাঙালি স্বাধীনতা, আত্মপরিচয়, মর্যাদা, একটি ভুখন্ড ও একটি দেশ পেয়েছে।

জাতির পিতার ৪৪ মাসের শাসনকালে যুদ্ধ বিধ্বস্ত বাংলাদেশকে পুনর্গঠনের প্রসঙ্গ টেনে প্রধানমন্ত্রী বলেন, মাত্র সাড়ে ৩ বছরে তিনি একটি যুদ্ধ বিধ্বস্ত দেশকে গড়ে তুলছিলেন। এত স্বল্প সময়ের মধ্যে একটা যুদ্ধ বিধ্বস্ত দেশকে গড়ে তোলার পাশাপাশি মানুষের অর্থনৈতিক মুক্তির জন্য সফলভাবে কাজ করে বাংলাদেশকে স্বল্পোন্নত দেশে উন্নীত করেছিলেন। অর্থনৈতিক মুক্তির জন্য জাতীয় ঐক্যের ডাক দিয়ে তিনি যে কর্মসূচি হাতে নিয়েছিলেন সেটা যদি বাস্তবায়ন করে যেতে পারতেন তাহলে বাংলার মানুষ তার গণতান্ত্রিক অধিকার এবং অর্থনৈতিক মুক্তি অর্জনের মাধ্যমে ক্ষুধা ও দারিদ্র থেকে মুক্তি পেয়ে উন্নত জীবন পেতে পারত। কিন্তু ঘাতকের দল সেটা হতে দেয়নি।

তিনি বলেন, যারা স্বাধীনতা চায়নি, বাঙালির বিজয় চায়নি তারাই নির্মমভাবে তাকে হত্যা করে এবং কিছু লোকতো বেইমানিও করে, মুনাফেকী করে- এটাই হচ্ছে আমাদের জন্য সব থেকে দুর্ভাগ্যের।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, তিনি এবং তার ছোট বোন (শেখ রেহানা) বিদেশে থাকায় ’৭৫ এর ১৫ আগস্টের বিয়োগান্তক অধ্যায় থেকে প্রাণে বেঁচে গেলেও এদেশে ফিরে আসার অধিকার হারান।

শেখ হাসিনা বলেন, আমাদের আসতে (দেশে) দেয়নি। পরবাসে জীবন কাটাতে হয়েছিল রিফিউজি হিসেবে, নিজেদের পরিচয়ও পরিবর্তন করে।

১৯৮১ সালে বাংলাদেশে আওয়ামী লীগের সভাপতি নির্বাচিত হওয়ার পর একরকম জোর করে দেশে ফিরে আসার স্মৃতিচারণ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ’৮১ সালে দেশে ফিরে আসার সুযোগ পেয়েছিলাম। ছোট ছোট ছেলে-মেয়েকে রেহানার কাছে রেখে আমি চলে আসি বাংলাদেশে। ফিরে আসি একটাই লক্ষ্য নিয়ে- যে আদর্শের জন্য আমার বাবা সংগ্রাম করে গেছেন। যে দেশের মানুষের মুক্তির জন্য জাতির পিতা রক্ত দিয়ে গেছেন। রক্ত দিয়ে গেছেন আমার মা, আমার ভাইয়েরা, লাখো শহিদ রক্ত দিয়েছেন। সেই দেশের মানুষের ভাগ্য পরিবর্তন করাটাই আমার একমাত্র লক্ষ্য ছিল।

শেখ হাসিনা বলেন, দীর্ঘ ২১ বছর সংগ্রাম করে যখন সরকার গঠনের সুযোগ পেলাম তারপর থেকে বাংলাদেশের উন্নয়নে আমি জাতির পিতার আদর্শই অনুসরণ করেছি। যে বাংলাদেশকে জাতির পিতা স্বল্পোন্নত দেশ হিসেবে রেখে গিয়েছিলেন আজকে বাংলাদেশ উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে। মাথাপিছু আয় ২ হাজার ২২৭ ডলারে উন্নীত হয়েছে, অর্থনৈতিক উন্নয়নের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ আজ বিশ্বে একটা মর্যাদা পেয়েছে। দারিদ্রের হার আমরা হ্রাস করতে সক্ষম হয়েছি, ৪৫ ভাগ থেকে ২০ ভাগে নামিয়ে এনেছি। মানুষের গড় আয়ু আজকে ৭২ বছরে উন্নীত হয়েছে।

প্রধানমন্ত্রী এ সময় মুজিববর্ষে দেশের সব ভূমিহীন-গৃহহীনকে ঘর-বাড়ি করার মাধ্যমে ঠিকানা গড়ে দেওয়ায় তার রাজনৈতিক অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেন।

তিনি বলেন, আমাদের লক্ষ্য হচ্ছে এদেশের একটি মানুষও আর দারিদ্রের কষাঘাতে জর্জরিত থাকবে না এবং একটি মানুষও ভূমিহীন থাকবে না। জাতির পিতা ‘গুচ্ছগ্রাম’ কর্মসূচির মাধ্যমে খাসজমি বিতরণ এবং দরিদ্র জনগণকে ঘর তৈরি করে দেওয়ার কর্মসূচি গ্রহণ করেছিলেন- আমরা তার জন্মশতবার্ষিকীতে এই সিদ্ধান্ত নিয়েছি যে, বাংলাদেশে আর একটি মানুষও গৃহহারা থাকবে না। কাজেই আমরা গৃহনির্মাণ করে দিচ্ছি।

প্রধানমন্ত্রী তার সরকারের চিকিৎসা সেবা মানুষের দোড়গোঁড়ায় পৌঁছে দেওয়া এবং প্রায় ৭৪ শতাংশ মানুষের সাক্ষরতা অর্জনের মাধ্যমে শিক্ষার আলো ঘরে ঘরে পৌঁছে দেওয়ার কথা উল্লেখ করে বলেন, বাংলাদেশ আজ সারাবিশ্বে উন্নয়নের বিস্ময়।

আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহণ ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের, বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান (ইউজিসি) অধ্যাপক আবদুল মান্নান, আওয়ামী যুবলীগের চেয়ারম্যান শেখ ফজলে শামস পরশ অনুষ্ঠানে আলোচনায় অংশ নেন।

বাংলাদেশ টেলিভিশনে প্রচারিত অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন বিশিষ্ট অভিনেত্রী এবং সাবেক প্রতিমন্ত্রী তারানা হালিম।